click on images to know more about the Images
১৮২৭ সালে মহারাষ্ট্রের পুনেতে এক মালী পরিবারে মহাত্মা জ্যোতি রাও ফুলে জন্ম গ্ৰহণ করেন, তার পিতার নাম ছিল গোবিন্দ রাও ফুলে এবং মাতার নাম চিমনবাঈ । পিতা ছিলেন পুণের একজন প্রতিষ্ঠিত ফুল বিক্রেতা।
ফুলে পরিবারে ইতিপূর্বে কেউ লেখাপড়া শেখার সুযোগ পাননি। গোবিন্দ রাও ভাবলেন তিনি তার ছেলেকে লেখাপড়া শেখাবেন। তাই তাকে একটি গ্ৰামের পাঠশালায় ভর্তি করে দিলেন । তখনকার দিনে সরকারী স্কুলের রেওয়াজ ছিল না । লেখাপড়া জানা ব্রাহ্মণেরা নিজের বাড়িতে বা মন্দিরে বসে ছেলেদের লেখাপড়া শেখাতেন । সৌভাগ্যের কথা ঐ সময় ১৯৩৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার গ্ৰামে গ্ৰামে স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত গ্ৰহন করেন এবং গোবিন্দ রাও দের গ্ৰামে একটা সরকারী স্কুল খোলার ব্যবস্থা করেন।
মাত্র ১৩ বৎসর বয়সে জ্যোতি রাও ফুলে বিবাহ করেন মাত্র ৮ বৎসর বয়সের বালিকা সাবিত্রী বাইকে ।
১৮৪১ সালে তিনি পুনের স্কটিশ মিশন হাইস্কুলে ভর্তি হন ।১৮৪৭ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ।
১৮৪৮ সালে সারা বিশ্বের ইতিহাসে নানা দিক দিয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের অশনিসংকেত দানা বাঁধতে শুরু করে । ঐ সালে লন্ডন থেকে কার্ল মার্কসের কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশিত হয় । আমেরিকাতে মালী অধিকারের দামামা বেজে ওঠে। ঐ বছরই আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে প্রথম হিউম্যান রাইটস কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয় । তখন ভারতের নারী সমাজ দাসত্বের গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত । হিন্দু ধর্মে নারী শিক্ষার কোন অধিকার ই ছিল না । হিন্দু ধর্মে ঘোষণা করেছে মালী মাত্র ই শূদ্রানী ।
১৮৪৮ সাল ভারতের নারী সমাজের কাছে একটি নবযুগের সন্ধিক্ষণ । এই বছরের প্রথম দিকে জ্যোতি রাও ফুলে সমাজের নিম্ন শ্রেণীর নারীদের শিক্ষার জন্য একটি স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করেন । তিনি মনে করতেন যে পুরুষের চেয়ে মেয়েদের আগে শিক্ষিত করা
প্রয়োজন। কারণ নারী হচ্ছে মাতৃজাতি । মায়ের কাছ থেকেই ছেলেমেয়েরা প্রথম শিক্ষা লাভ করে থাকে । কাজেই মা শিক্ষিতা হলে শিশুরা ঘরে বসে মায়ের কাছ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করতে পারবে।
জ্যোতি রাও এর সংগ্রামের অন্যতম সাথী ও আবাল্য বন্ধু সদাশিব গোবান্দে তখন আহমেদ নগরে , বিচারের অফিসে চাকুরী রত । তাদেরকে সক্রিয় সাহায্য করে ছিলেন মিস্ ফায়ার । ১৮৪৮ সালের আগস্ট মাসে ভারতের নিম্ন বর্ণের নারীদের জন্যে প্রথম স্কুল শুরু হয় । এ কাজে তিনি তাঁর স্ত্রী সাবিত্রী বাঈ ফুলেকে বেশ কিছু কাল ধরে ট্রেনিং দেন এবং সাবিত্রী বাঈ ফুলেকে ঐ স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ করেন । সাবিত্রী বাঈ ফুলেই ভারতের পিছিয়ে পড়া মানুষের নারী শিক্ষিকা । তার বাবা গোবিন্দ রাও ফুলে পুত্র বধুকে স্কুলের কাজ ছেড়ে দিতে বলেন । তিনি এ ও জানান যে, যদি সাবিত্রী বাঈ বন্ধ না করে তবে তার পক্ষে পুত্র বধুকে বাড়িতে স্থান দেওয়া সম্ভব নয় ।
নারী শিক্ষা জ্যোতি রাও এর কাছে ছিল আদর্শের ব্যাপার । তাই তিনি পিতৃগৃহে ত্যাগ করে পত্নীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান । তবু ও তিনি আদর্শ থেকে এক পদ ও বিচ্যুত হলেন না । গৃহ থেকে বিতাড়িত করেও যখন গোঁড়া ব্রাক্ষণেরা স্কুল বন্ধ করতে পারল না, তখন তারা স্কুলে যাতায়াত পথে মাতা সাবিত্রী বাঈ কে গালাগালি, ভীতি প্রদর্শন এমনকি তার প্রতি ঢিল পর্যন্ত ছুঁড়তে থাকল । সাবিত্রী বাঈ সব অপমান ও অত্যাচার সহ্য করে আপন কর্তব্য করে চললেন । ভারতের নারী শিক্ষার ইতিহাসে সাবিত্রী বাঈ ফুলের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। আজ মুম্বাই শহরে সবচেয়ে বিখ্যাত কলেজের নাম সাবিত্রী বাঈ ফুলে কলেজ ।
গোঁড়া ব্রাক্ষণেরা বিরোধীতা করলেও জ্যোতি রাও কে মেয়েদের স্কুল চালাতে সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছেন তার মানব দরদী দুই বন্ধু গোবান্দে ও বলবেকর । তাঁদের সহয়তায় জ্যোতিরাও ১৮৫১ ও ১৮৫২ সালে আরো দুটি মহিলাদের স্কুল চালু করেন ।
আমাদের বাংলাদেশের গোঁড়া হিন্দুরা ও ছিল নারী শিক্ষার ঘোর বিরোধী। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে যখন রাজা রামমোহন রায় , বিদ্যাসাগর, গুরুচাঁদ ঠাকুর নারী শিক্ষার প্রচলন শুরু করেন তখন ও তাঁদের প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাঁদের নানা প্রকার ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করা হয় । গোঁড়া হিন্দুদের প্রতিনিধি স্বরুপ ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তের একটি ব্যঙ্গ কবিতার দুটি লাইন এখানে উল্লেখ করা যেত পারে।
ছুড়ি গুলি তুড়ি মেরে কেতাব হাতে নিচ্ছে তবে
এ বি শিখে বিবি সেজে বিলাতি বোল করতেই হবে ।
ভারতে নারী শিক্ষার ইতিহাসে মেয়েদের জন্য প্রথম স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় কলিকাতায় ১৯১৮ সালে । এর পর মুম্বাইতে আমেরিকার খৃস্টান মিশনারীরা প্রথম মেয়েদের স্কুল শুরু করেন ১৮২৪ সালে, পুনেতে ১৮৪০ সালে ।
ফুলের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয় হল নিম্ন বর্ণের মানুষের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রথম স্কুল এবং এই স্কুলের শিক্ষিকা সাবিত্রী বাঈ ফুলে হলেন ভারতের প্রথম মহিলা শিক্ষিকা।
সত্যশোধক সমাজ
সংযত আচরণ , বাধ্যতামূলক শিক্ষা, স্বদেশী দ্রব্যের ব্যবহার, ব্রাক্ষণ বিহীন বিবাহ ব্যবস্থা, জ্যোতিষ, ভূত কল্পিত দেব দানবের ভীতি হতে মানুষকে মুক্ত করা ।প্রধান আক্রমণ ছিল জাতিভেদ ও মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে । সত্যশোধক সমাজ বর্তমান ভারতের সামাজিক আন্দোলনের প্রথম প্রতিষ্ঠান।
১৮৭৩ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর ব্রাক্ষণ বিহীন বিবাহ অনুষ্ঠান হল মাত্র পান সুপারী র খরচায় । সত্যশোধক সমাজের সমর্থক ও কর্মীরা বিশ্বাস করতেন ইংরেজ শাসন ঈশ্বরের বিধান, কারণ ইংরেজ শাসনেই তারা শিক্ষার সুযোগ ও মানবিক অধিকার ফিরে পেয়েছেন । ১৮৮০ সালের প্রথম দিকে বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষার দাবি জানান। ১৮৮১ সালে গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে খুলনার দত্ত ডাঙায় ঈশ্বর গাইনের মাতৃ বিয়োগ এর শ্রদ্ধা অনুষ্ঠান কে কেন্দ্র করে শিক্ষা আন্দোলন শুরু হয় । ১৮৮২ সালে হান্টার কমিশনে প্রাথমিক শিক্ষা ১২ বৎসর পর্যন্ত বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন ঘোষনা করা হয় এবং নিম্ন বর্ণের শিশুদের জন্য আলাদা স্কুল খোলা হোক এটি ও ঘোষিত হয়।
তিনি প্রস্তাব রাখেন যেহেতু ইনস্পেক্টর বছরে মাত্র একবার স্কুল পরিদর্শন করে,তাতে শিক্ষকদের কোন ভীতি থাকে না । তাই বছরে অন্তত তিন বার স্কুল পরিদর্শন করতে হবে এবং তাও আকস্মিক ভাবে । স্কুল কর্তৃপক্ষকে সংবাদ দিয়ে আসা চলবে না ।
সবশেষে তিনি কমিশনারের কাছে সন্নিবদ্ধ অনুরোধ জানান সমাজের যে সমস্ত শ্রেণীর মধ্যে শিক্ষার বিস্তার আদৌ ঘটেনি, তাঁদের জন্য সরকারী বৃত্তি দানের ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রাথমিক
শিক্ষা ও নারী শিক্ষার জন্য উদার হস্তে অর্থ মঞ্জুর করতে হবে ।
জ্যোতি রাও নিম্ন বর্ণের ছেলে মেয়েদের বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক ছাত্রাবাসে থাকা, খাওয়া ও স্কুলে পড়ার সুযোগ দানের জন্য সরকারকে অনুরোধ জানান।
ধর্মীয়ভাবে কৃষক ও দরিদ্র শ্রমিকরা যাতে ব্রাক্ষণদের চক্রান্তে আবদ্ধ হয়ে পুরোহিতের পা ধোয়া জল খাওয়া, গরু, মহিষ, ভূত, প্রেত, বটবৃক্ষ বা তুলসী পূজা প্রভৃতি থেকে বিরত হয় , সে বিষয়ে তাঁদের সম্যক জ্ঞান দান করতে হবে ।
জাতির প্রতি ভালোবাসা, দেশের প্রতি ভালোবাসা, সমাজের প্রতি দরদ, চরিত্র মাধুর্য, নির্ভীকতা, নিরপেক্ষতা , উদারতা, সততা ও মহত্ব যার ভীতরে থাকে তিনিই মহাত্মা । জ্যোতি রাও ই সমগ্র ভারতবর্ষের প্রথম মহামানব যাকে দেশের সাধারণ মানুষ এই সর্বোচ্চ উপাধি ও প্রশংসায় ভূষিত করেন ।
জ্যোতি রাও এর অভিমত হল। স্বর্গ বলে কিছু নেই । নারী পুরুষ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, মাতা ছাড়া সকলের ঋণ শোধ করা যায় । স্ত্রী লোক স্বভাবতই দুর্বল, পুরুষ সাহসী ।১৮৮৯ সালে তার নেতৃত্বে বেতন বৃদ্ধির জন্য যাহার ও ঝাড়ুদার দের ধর্ম ঘট হয় । দীর্ঘ ৪০ বৎসর তিনি নারী মুক্তির আন্দোলন করে গেছেন। তাঁর মতে মৃত্যুতে শোকের কিছু থাকে না , কেননা পার্থিব সমস্ত বস্ত্র ই ক্ষয় আছে ।
জ্যোতি রাও এর ভবিষ্যৎ বাণী:---
যতদিন না অতি শূদ্র বা অস্পৃশ্য, কোল-ভীলদের ঘরের সন্তান যথার্থ শিক্ষা লাভ করে সমাজে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে আসবে, ততদিন আমার সমাধির উপর পুষ্পার্ঘ অর্পণ করে আমার জয়গান করবে না। ।