click on images to know more about the Images
না না অন্য একদিন এসে খাব, আজ আর খাওয়ার সময় হচ্ছে না। বিনা খুব আফসোস করে কিছুটা টেনে নরম শুরে বলে, " আচ্ছা বছরে এক আধদিন এলেই যদি তবুও এতো ব্যস্ততা নিয়ে যে একটু সময় করে নাখে মুখে একটু খাওয়ার সময় থাকে না। " এক কথার উত্তর সহসা নিরেনের দেওয়া সম্ভব হল না। " দাও খেতে" বলে টিউবওয়েলে হাত ধুতে গেল। "সেই সকালে দেখেই আমি ভাত ও আনুসঙ্গিক সমস্ত রান্না করে নিয়ে আশায় আশায় বসে আছি। এখন প্রায় বিকাল তিনটে বাজে । আমি তোমাকে দেখে সেন্টারে পর্যন্ত যায়নি। " বিমলাকে সেন্টার চালিয়ে নিতে বলেছি", বলে বিনা। "একটু বসো, কাজের ধন আমার, খাওয়ার গুলো ঠান্ডা বরফ হয়ে গেছে একটু গরম করে নি" বীনা বলে, প্রায় এক নিশ্বাসে। "না না তার আর দরকার হবেনা। জানইতো যারা রাজনীতি করে তারা বউয়ের গরম গরম কথা আর ঠাণ্ডা ভাত খাওয়ার অভ্যাস করে নেই" নীরেনও বলে প্রায় এক নিশ্বাসে। "খুব সুন্দর রান্না হয়েছে " বলে নীরেন। " ছেলেদের এই অভ্যাসটা গেল না অহেতুক প্রশংসা করা। কি এমন রান্না হয়েছে ? " বলে বীণা। ছেলেদের মানে, তুমি কি দেশ শুদ্ধ ছেলেদের খাইয়ে বেড়াও নাকি?" বলে নীরেন। যদিও খোচা দেওয়া কথা কিন্তু কথায় তেমন উত্তাপ ছিল না। মস্করাই বলা যায়।
গ্রামের ক্লাবের ছেলেরা এবার যাত্রা পালা ধরেছে। দুর্গা পূজায় নামাবে। যাত্রার পালার নাম ৪২ এর বিপ্লব। বীনারও একটি অভিনয় আছে। চরিত্রের নাম শিখা। জমিদার কন্যা । বীনা কথা গুলি বলার পরেই বলে নীরেণ।, "আর কদিন মাত্র বাকি। এই অষ্টমীর রাত্রিতেই হবে। " এবারের দূর্গা পূজার কটা দিন না হয় থাকলেই বা," বলে বীনা।
নীরেন গিয়েছিল সেই ৪২ এর বিপ্লবের অভিনয় দেখতে। নিজে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের এক জন মনে করেন। কিন্তু এটাও মনে করেন যে জমিদারদের ব্রীটিশদের বিরুদ্ধ আচরণ করা ভালো ফল নয়। দাদা জমিদারি দেখা শুনা করেন কিন্তু তিনি এক স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গুপ্তচর। মানে গোপনে ছদ্মবেশে স্বাধীনতা গ্রামীদের সাহায্য করেন। মানে একজন খাটি বিপ্লবীই বলা যায়। এটা কিন্তু শিখা জানতো না, এটা পরে জানতে পেরে শিখা আনন্দে আপ্লুত হয় এবং দাদা যে বিপ্লবী জানতে পেরে আরো আপ্লুত ও গর্বিত হয় ও আশ্চর্যও কম হয়না । বীনার অভিনয় সত্যিই খুব ভালো লেগেছিল নীরেণের ।
হঠাৎ একদিন লালবাগে এক্সচেঞ্জ অফিসে নীরেনের সঙ্গে বীনার দেখা। দুই জনেই চাকরির কল পাওয়ার জন্য নাম নথিভুক্ত করতে গিয়েছে। যাকে এক্সচেঞ্জে নাম রেজিস্ট্রেশন বলে। দুই জনেরই কাজ হয়ে গেছে। মুর্শিদাবাদের লালবাগ এক সময়ের নবাব মুর্শিদকুলি খাঁনের বাংলা বিহার উড়িষ্যার রাজধানী । ওখানে হাজার দোয়ারি নবাব প্যালেস। ইতিহাস বলে পরাধীন নবাব হুমায়ুনজা এই হাজার দুয়ারি নবাব প্যালেশ তৈরী করেন। দুই জনের মধ্যে সেখানেই অনেক কথা হয়ে যায় । তাতে ঠিক হয় নবাব প্যালেসে ঘুরতে যাওয়ার। সেখানে গিয়েই টমটম বালাদের সোয়ারী গাড়ি ওয়ালারা বলছে আসুন দাদা দিদিরা লালবাগের ঐতিহাসিক স্থান নবাব প্যালেশ হাজার দোয়ারি,সিরাজ দৌল্লার কবর স্থান, মির্জাফরের বংশীয় কবর খানা, মির্জাফরের বাস ভবন, উমিচাঁদের বাস ভবন, মতিঝিল, ঘোসিটি বেগমের কবরখানা, কাটরা মসজিদ আরো ইত্যাদি ইতিহাস প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক স্থান আর দেরি না করে ঘুরবেন আসুন, বলে ঘোড়াকে একটু তাগল দিয়ে চনমনে ঘোড়ার তেজ দেখিয়ে দেয় । বেশি ভাবনা চিন্তা না করে সোয়ারীতে চেপে বসল দুই জনে । যেন আজকে মনে হল নবাব জাদা নবাব জাদী যেন রাজ্য দর্শণে বেরিয়ে গেল । অনতি দূরে কোথাও যেন ককিলের কুহুকুহু ডাক ফাল্গুন মাস বসন্ত কাল স্মরণ করিয়ে দেয় । রাস্তায় মাঝে মাঝে আম্রকানন। মুকুলে মুকুলে মুকুলিত হয়ে ছেয়ে গেছে বাগিচার জাতীয় ফলের বৃক্ষগুলি। আম্র ফুলের বাতাস মাতানো উগ্র কাঁচা রেনুর সুমধুর গন্ধে মাতুয়ারা ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ শহরের আনাচে কানাচের গ্রাম্যপথ থেকে রাজ পথ পর্যন্ত। রাস্তার কোনো কোনো জায়গাই পুস্ফুটিত চকচকে বেগুনি গোলাপী রং এর কাঞ্চন ফুলের বাহারি দৃশ্যে অপরূপময় করে তুলেছে, এক সময়ের ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ রাজধানীকে। আজ মনে হল নীরেন বীনাকে ভিন দেশের বিদেশী রাজকুমার রাজকুমারীর মধ্যে প্রেমময় অনুরাগে সঞ্চিত পূর্বরাগের বিস্ফরণ। দুই জন ধরা দিয়েছে আজ সাহজাদা সাহজাদী হিসাবে। কত গল্প কত গাঁথা মনে পড়ে দুই জনের মুকুলিত হেলদলিত প্রেমময় হৃদয়ে। কত কথা জেগে উঠে মনে প্রাণে হৃদয়ে । এক সঙ্গে বিচ্ছুরিত ভাবে বেরিয়ে আসতে চাই মনের অনেক কথা। কথা সাময়িক ভাবে বন্ধ হয়ে যায় কিছুক্ষণ ঐতিহাসিক স্পট পরিদর্শনের সময়। আবার উঠে সোওয়ারীতে। নামে উঠে গল্পও মেতে উঠে। কিছু কথায় মৌনতাও হয়ে যায়। কোনো কোনো কথার পরস্পরের উত্তরই হয়না। অমিমাংসিত থেকে যায়। শেষে বাংলা বিহার উড়িষ্যার রাজধানী হাজার দুয়ারী ও হাজার দুয়ারী প্যালেশের অন্দরেই ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরের আম্রকাননে যুদ্ধে মির্জাফরের মির্জাফরিত নবাবের পরাজয়ের পরে ফেলে আশা কামান বিভিন্ন অস্ত্র সস্ত্র ঢাল তারোয়াল লোহার জালের তৈরী মস্তকরক্ষক লোহার বক্ষ বর্ম সিরাজদৌল্লার তালোয়ার পিতলের তৎকালীন উন্নত কামান ইত্যাদি দিয়ে সাজানো অস্ত্র মিউজিয়াম। বাদ গেলনা নবাবের থালাবাসন শখের মমিকরা ময়ূর থেকে শুরু করে বিভিন্ন পাখ পাখালি। আর দেখল বিদেশী শিল্পীর আকা দৃশ্য তৈলচিত্র। যে ছবির দিকে তাকিয়ে থাকলেও কিছুই দেখা যায়না অথচ গাইড ছবিটির যে অঙ্গের কথা বলছে সেই অঙ্গই মুহূর্তে দৃশ্যমান হচ্ছে। ম্যাজিক মিরর তাদের খুব আশ্চর্য করল। এই মিররটি এমন কৌশল করে বসানো যে কেবলমাত্র অপরের ছবি কেবল মাত্র দেখা যায় কিন্তু নিজেকে দেখা যায়না। নীরেন নিজের ছবি কোনো ভাবেই নিজেকে দেখতে পেল না। বীনার ক্ষেত্রেও একই ভাবে উল্টোটা হল নীরেনের ছবি দেখল কিন্তু নিজের ছবির বেলায় নিজেকে কোথায় হারিয়ে ফেলল। নাকুড়তলার তোফখানা বাচ্চাখাকি কামানও দেখেছে। এই কামান দেখে মনে মনে আনজাদ হয়েছিল মির্জাফরের ষড়যন্ত্র ছাড়া নবাবের হার কখনো সম্ভব হতো না । পরিশেষে একেবারে বিকেলের হাজার দোয়ারীর পাসের হোটেলে খাওয়া দাওয়া করে আবারও হাজার দোয়ারীর সামনের মাঠে পৌচ্ছালেন। মন যেনো ছেড়ে যেতে চায়া না ঐতিহাসিক শহর ছেড়ে যেতে। খুব ঘুরাঘুরি হল দুই জনেই যেনো একটু ক্লান্ত। হাজার দোয়ারীর সামনের মাঠটিকে সদ্য কয়েক বছর হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাবেক বিপনন ও ত্রান মন্ত্রী মাননীয়া শ্রীমতি ছায়া ঘোষের দ্বারা সরকারের আর্থিক সহায়তায় নবরূপে সাজিয়ে তুলেছেন। বিভিন্ন রং এর গোলাপ ফুল থেকে শুরু করে হরেক রকম রং বেরং এর ফুলে সেজে উঠেছে যেন পুষ্প প্যালেশ । ফুল ছাড়াও বিভিন্ন রকমের রং বেরংএর পাতাবাহার ঝাউ বৃক্ষগুলি কিছুটা পরিণতি পেলেও বকুল গাছ এখনো সেই রকম পরিণতি পায়নি শিশু থেকে বালকে পরিণত হয়েছে বলা যায়। সেই রকম একটি বকুল তলায় গিয়ে বসে দুই জন। একেবারে শিশু বালক বকুল বৃক্ষর এখন দুই জনকে ছায়া দেওয়ার মত ডালপালা ছড়াতে পারিনি। তবুও বসন্তের বিকেলের শেষে লম্বা ছায়া তাদের দুই জনের মাথার উপর শিশু বকুল গাছের ছায়ার ছাতাটি মন্দ নয় বলাই যায়। পরস্পর হাত ধরে বসে পড়ে গাছ তলায়। আজ যেনো তাদের দুটি হৃদয়কে নিকট করে ফেলেছে প্রেমময় বন্ধনে। "খুব ক্লান্ত লাগছে তোমাকে",বলে বীণা । নীরেনের মাথাটি বীণার কোলে দিয়ে যেনো স্বর্গের সুখ অনুভব করতে থাকে নীরেন। নীরেনের মাথা সারাদিন ঘুরাঘুরির পর সামান্য ধুলিকণাসিক্ত রুক্ষ চুল গুলিতে ডান হাতের পাঁচ আঙ্গুলে বিলি দিতে থাকে বীণা । নীরেন কোনো আপত্তি করে না কিন্তু গা কন্টকিত হয়ে উঠে আবেগঘন প্রেমের ছোয়ায়। । ভাবে এটা বাস্তবে পরিণত হবেতো! হলে কতদিনে হবে, জিঞ্জাসা করে মনকে বারে বারে। কিছুটা সময় শব্দহীন নির্বাক মৌন দুই জনে। বীণাও হয়তো নীরেনের ভাবনাটাই ভাবছে। যুগ পাল্টেছে কর্মহীন অবস্থায় সংসারের ঢালু পথে পা বাড়াতে পারার কথা ভাবতেও পারছে না। বীণাকে সুখী করে রাখতে হবতো। নীরেনদেরও জমি জায়গা নেই তেমন। কয়েক বিঘা চাষের জমি। বাবা ক্ষেতে প্রচণ্ড খাটে। দিন চলে যায় মোটা ভাত কাপড়ে। নীরেন বীরেন দুই ভাই অদূর ভবিষ্যতে জমি দুই ভায়ে ভাগ হলে মোটা ভাত কাপড়েও চলা সম্ভব হবে না হয়তো । নীরেনের বাবারাও দুই ভাই। কিন্তু জ্যাঠা মশায়ের কোনো সন্তানাদি নেই। আর হওয়ার সম্ভনাও নেই বলা যায়। জেঠিমা নীরেনদের স্নানাদি স্কুলে পাঠানো সব তদারকি করার দায়িত্ব পালনে ঘাটতি হয়না কোনো দিন । নীরেনের মা এসবের ঝামেলায় নেই। হেঁশেল সামলানোয় সে সদাব্যস্ত।
রবির আর ঝলস নেই গোধূলি বেলা। ফিরতে হবে। পরস্পরের হাতের কব্জিতে ভর রেখে উঠে দাড়ায় দুইজনে।
উচ্ছৃশৃঙ্খল পদ্মা হাজার হাজার চাঁই জন গোষ্ঠীর মানুষের বাস্তু ভিটা গ্রাস করতে করতে বামনা বাদের নিচে চলে এসেছে । ভিটে মাটি ধুয়ে খেয়ে বিস্তৃর্ণ বালুকা ভূমি উপহার দিয়ে চলেও গেছে। উচু পাড়ের নিচে দিয়ে মৃদু মন্দ জল প্রবাহের দিক দিয়ে স্রোতার রূপ নিয়ে যৌবন হারানো রূপবতীর রূপে স্বমহীমায় প্রবাহিত। তারই মধ্যে মৎস্যজীবীরা অল্প জলের সুযোগ নিয়ে ছোটো নৌকায় করে বড়ো বড়ো মশারির জাল দিয়ে নানান ধরনের ছোটো মাছ গুলি এই স্রোতা পদ্মার বক্ষ থেকে প্রায় নিঃশেষ করছে। লম্বা রেখাময় জল রাশির উপরে উড়ন্ত মৎস শিকারিগণ মাঝে মাঝে ছো মেরে মৎস শিকার করে জঠর জ্বালা মিটাচ্ছ। স্রোতার অপর পারে চর দিয়াড়ার মাঠে পত্রহীন শিমুল গাছে গাছে লাল রংএর রাশি রাশি কুসুম রাশি লাল বাহারে রাঙ্গিয়ে তুলেছে। বসন্তের চিরসখা কোকিল গুলি কুহু কুহু সুমিষ্ট কূজনে সাথীহারা প্রেমিক প্রেমিকা জনের অন্তরে অন্তরে শেল নিক্ষেপ করছে। নীরেণ বীণার বিরামহীন নানান গল্পের যেনো শেষ নেই আদি নেই অন্ত নেই, ত্র নেই কোনো বিরামের লেস মাত্র। শিহরণ জাগে দুটি মনে প্রাণে হৃদয়ে। কখন যেনো ঘুমের জগতে হারিয়ে যায় যুগলে।
বেকারত্বের জ্বালা। চাকরীর বিজ্ঞাপন দেখেে দেখে অনেক চিঠি চাপাটি করতে থাকে নীরেণ। প্রচুর ইন্টারভিউ দেয়। যোগ্য হয়ে উঠতে পারে না পয়সার জোরে অযোগ্য ৃ৺ প্রতিযোগীদের ভীড়ে। তবুও চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখে না একটি চাকরি জন্য।
৪ঠা বৈশাখ মহিশমারীতে চড়ক মেলা। প্রচন্ড গরম। সীমাহীন সূর্যের তাপ বর্ষণে মাঠে মাঠে রংহীন অগ্নিরাশি ধুধু করছে। ঝরা পাতার বৃক্ষগুলি নব পত্রের মঞ্জুরী ছেড়ে নবপত্রে সজ্জিত হয়ে নব পল্লবে পল্লবিত হয়ে সুসজ্জিত হওয়ার চেষ্টায় মত্ত আছে। মাস হিসেবে বসন্ত কাল বিদায় হলেও বসন্তের কোকিল এখনো বিদায় হয়নি। কাঞ্চন ফুলের বাহার এখনো ম্লান হয়নি। পলাশ বনে পলাশ ফুলকে ঝালসানো আগুন এখনো নিভিয়ে যায়নি। দিকে দিকে লালের সমারোহের শিমুল ফুল গুলি ঝরে পড়া শেষ হয়নি। এখনো লালের মেলা শিমুল গাছে গাছে বর্তমান। বৈশাখের বৈকালের পড়ন্ত বেলায় সূর্যের প্রখর রৌদ্রের দাবদাহের রশ্মির তেজ কমলেও ঘুমোট গরমের প্রবাহের তেজে মেলার ঘেমে ঘরমাক্ত। তবুও মেলার অগুনিত মানুষ মেলার আনন্দে এই গরমকে তেমন পাত্তা না দিয়ে মেলায় চলছে হরেক বেচাকেনা ও দেদার চলছে খাওয়া দাওয়া ঝুরি ঝালবড়া জিলিপি পাপড় বাদাম এগরোল মোগলাই ফুচকা। তবে তীব্র গরমের ফলে বিভিন্ন রকমের আইসক্রিমের প্রতি যেনো প্রতি আকর্ষণ বেশি একটু কুল হওয়ার জন্য। সারি বদ্ধ হরেক মালের দোকানে ভালোই ভীড়। দোকানে দোকানে বক্স মাইকে লাগাতার প্রচার চলছে, নিয়ে যান দাদা বৌদি মা বোনেরা হরেক মাল যা নেবে দশ টাকা কোনো দোকানে কুড়ি টাকা কোনো দোকানে পঞ্চাশ টাকা। এক এক দিকে সারিবদ্ধ ভাবে এক এক ধরনের দোকান । কোনো সারিতে মনহারি কোনো সারিতে গ্রাম্য জীবনে ব্যবহার্য লোহার ছুরি কাচি চিচকে হাতা ছাকনা হেসো পাসলি দা রামদা ইত্যাদি। কাঠের সামগ্রী বেলুন পিড়ে বাদ নেই ডাল ঘুটনিও। কোনো সারিতে স্টেনলেশ স্টীলের অ্যালোমিনিয়ামের থালা বাটি ছাকনি বাদ নেই পাথরের শীলা বাটি ও ধুপদানি। সারিবদ্ধ মাটির পুতুল বিভিন্ন দেব দেবীর ছোটো মূর্তি সুসজ্জিত। এ এক অপরূপ দৃশ্য মন কাড়ার মতো।
নীরেন দুটি পাপড় হাতে নিয়ে এসে দুজনে দাড়ায় রাস্তার ধারের ভেটুল তলায়। একটি পাপড় বীণার হাতে দেয়। বীণা পাপড়ে একটি সুখ কামড় দিতেই মচমচে পাপড় খসে পড়ে। তা পড়ন্ত পাপড় টুকরো লুফে নিয়ে গুজে দেয় বীণার নরম ঠোঁটের ফাকে। বীণা খিলখিল করে হেসে বলে ' " এই, অনেকে দেখছে এটা মানুষ ভালো চোখে দেখবে না।
বীণার ঠিকানায় একটি পত্র এলো নীরেনের।
বন্ধুবরেষু,
স্নেহভাজন বীনা আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নিও। গুরুজনদের প্রণাম ও ছোটোদের স্নেহাদর। প্রিয়তমা আমারেই। অনেক দিন থেকে ভেবে চিনতে দেখলাম আর্থিক সংকট ও বেরোজগার অবস্থায় পরিনয় বন্ধন হয়ে হয়তো আমাদের মধ্যে সুখ না থাকলেও শান্তি থাকবে আর্থিক সংকট থাকলেও ভালোবাসা থাকবে কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঠিক ঠাক করে তুলতে পারবনা। তাই আমি ভিন রাজ্যে কাজের জন্য পাড়ি দিলাম।আমাদের প্রেমের সফলতা আনতে ফিরে না আসা পর্যন্ত তোমাকে অপেক্ষা করতেই হবে। কাজে স্থায়ি হয়ে পত্র দিলে উত্তর দিও। আরেক বার শুভেচ্ছা জানিয়ে পত্র লিখন সাঙ্গ করলাম।
ইতি
তোমারেই নীরেন।
বীণা উল্টে পাল্টে পত্র খানা বার কয়েক পড়ে কপালে হাত দিয়ে বিবস হয়ে বসে পড়ে। হাতের পত্রটি কখন মেঝেতে হাত থেকে ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকে। বীণার মস্তকে এক পাহাড় চিন্তা এক সমুদ্র ভাবনা নিয়ে অকুল দরিয়ায় মনটি সাঁতার কাটতে কাটতে এক সময় ক্লান্ত পরিশান্ত হয়ে বিভোর ঘুমে আছন্ন হয়ে পড়ে। পত্র খানা মেঝেতেই পড়ে থাকে তুলে রাখতে ভুলে যায়। পত্রটি,বীণার মা নিরক্ষর মানুষ ঘর ছাড় দিতে গিয়ে পায়। তেমন কিছু গুরুত্ব না বুঝেই ঘরের এক কোনের দলঙ্গিতে তুলে রেখে ঘর ছাড় দিয়ে বেরিয়ে যায়। বীণা প্রাণপ্রিয়ের আশায় আশায় দিন এক রকম গুনে গুথে যেতে থাকে।
বীণা পত্রের আশায় উদগ্রীব হয়ে পড়ে। পত্র কিছুতেই আসেনা। মনে হয় পোষ্ট্যাল সার্ভিস যেন বন্ধ ।
নীরেনের পাঠানো যে পত্রটি বীনার মা পেয়ে দলঙ্গীতে রেখেছিল তার কয়েক দিন পরেই বীনার জামাই বাবু শ্বশুরবাড়ি আসে। মানে বিনার বাবার বাড়িতে আসে। তার ঐ দলঙ্গিতে শ্বশুরবাড়ি এলেই বিড়ি রাখার অভ্যাস ছিল। অভ্যাস বসত বিড়ি রাখতে গিয়ে পত্রটি দেখতে পায় এবং এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলে। বুঝতে অসুবিধা হয়না যে এটা বীণাকে পাঠানো প্রেম পত্র। বীণার দিদি ছিল প্রায় চির রোগী কিন্তু বিছানাগত কিন্তু দ্রুত ইহলোক পরিত্যাগ করার ও খুব একটা দৃঢ় আশা ছিলনা। বীণার জামাই বাবু কৃষ্ণমোহনের চরিত্রে কৃষ্ণের মত যুবতির নারী প্রতি একটু বেশি আসক্ত ছিল। এই প্রেম মনে মনে মেনে নিতে পারল না। পরবর্তী নীরেনের পাঠানো পত্রগুলি সময় মতো খোঁজ খবর নিয়ে হস্তগত করে গায়েব করতে থাকল। ফলে নীরেনের দেওয়া পত্র পাওয়া একেবারে বন্ধু হয়ে গেল । এতে দুজনেই পরস্পরের প্রতি তিতিবিরক্ত হতে লাগল এবং পরস্পর দুজন দুজনকে বেইমানের সঙ্গে তুলনা করতো। মুহূর্তে আবার মনে হত না না এটা হতেই পারে না। এটা ভাবার জন্য অনুতপ্ত হত। হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হত। হৃদয়ে বজ্রপাত হত। বুকের মধ্যে মুহুর্মুহু বিষের সেল হানত। কিছুটা হলেও নীরেনের ঔষধের ব্যবসায় অনেকটাই সময় কাটত। ঔষধের ব্যবসার পালে ভালোই হাওয়া লেগে গেল। বীণার কথা ব্যবসার ব্যস্ততায় ভুলতে বসল প্রায়। মাঝে মধ্যে পত্র এক একটা পাঠালেও কৃষ্ণমোহনের তৎপরতায় তারই হস্তগত হত। " মণ্ডল ড্রাগএজেন্সি লিমিটেড " একটি ঔষধ সাপলায়ের সংস্থা ব্যাঙ্গালরে ভালই ভুলে ফেপে উঠল। নীরেন ঔষধের ব্যবসা এতই বিস্তার লাভ করল যে দিন রাত এক করে ব্যবসার কাজে সময় দিতে হত। ব্যবসাটা তার এক সময় সাধনায় পরিণত হল। এতে তার ফলও মিললো আকাশ কুশুম। এটা নীরেনের নিষ্ঠা সততা শ্রম ও অধ্যাবসায়ের ফল অবশ্যই বলাই যায়। ব্যবসার কাজে আরও কিছু শিক্ষিত ছেলের প্রয়োজন হল। মনে করল দেশের কিছু ছেলে এনে কাজে লাগাতে পারলে তাদেরও কাজের সংস্থান হয়। গ্রামের বেকার যুবকদের বেকারত্বও কিছুটা দূর হয়। সময় ও কাজের অনেক হিসেব নিকেশ মিলিয়ে ফ্লাইটে করে দমদম বিমান বন্দরে নেমে ট্রেন বাস করে স্বগ্রামে ফিরল। প্লেনে ট্রেনে বাসে আসার সময় ব্যবসার চিন্তা তেমন না থাকাই বীণার ভালোবাসার টান মাথায় চেপে বসল। গোটা রাস্তায় আসতে আসতে বীণার এক সমুদ্র জলের সমান প্রেম ভালোবাসা ভর করে ছিল। সেটাই কেবল নীরেনের অন্তরের অন্তঃস্থলে ট্ররনডের মতো আলড়িত হয়ে বজ্রের শব্দের ন্যায় ধ্বনিত হচ্ছিল। বাড়ি পৌঁছনোর দিনেই সে সরাসরি বীণা বাড়ি গেল। আজ আর তার অর্থ কড়ি গাড়ি বাড়ি কোনো কিছুরই অভাব নেই। সে আজ সম্পূর্ণ রূপে স্বাবলম্বি। শুধু তাই নয় তার এজেন্সিতে এখন একশত ছেলে ন্যায্য বেতনে কাজ করে। ব্যবসা যেভাবে বেড়েছে পঞ্চাশ ছেলে অতি সত্ত্বর চায়। আজ বীণার কোনো অভিভাবক বিয়ের প্রস্তাবে না বলার কোনো কারণই হতে পারে না। হঠাৎ তার মনে হল, বীণা অবিবাহিত আদও আছেতো! গিয়ে যা দেখল তাহল বড়ই চিন্তার কারণ। সে হঠাৎ হতবম্ব হয়ে গেল। অবিবাহিত অবশ্যই আছে কিন্তু বীণা বিছানাগত মুমূর্ষু অবস্থায়। বিছানার চারিদিকে ঘিরে আছে আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবাসি জ্ঞাতি বন্ধু মুখে জল দেওয়ার অপেক্ষায়। জামাইবাবু কৃষ্ণমোহন ক্ষয় রোগে বছর খানেক আগেই গত হয়েছেন। বীণাও প্রায় এক বছরের কিছু বেশি আগে থেকে অসুস্থ হয়ে আছে কিন্তু ডাক্তার মরে যাওয়ারও বিশেষ রোগ ণির্ণয় করতে পারিনি। কেবল মাত্র কয়েক দিন আগে এক ডাক্তার বাবু বলেছেন এ অবস্থা মনের রোগ থেকেই হয়েছে কিন্তু আর সময় নেই। নীরেন বীণার হাতটি চেপে ধরে ডাক দিল, বীণা আমি এসেছি তাকাও । মনে হল বীণা প্রাণ শক্তির সর্ব শেষ শক্তি প্রয়োগ করে চোখের পলক খুলে একটা চরম আকাঙ্খিত চাহনি চেয়ে চোখের জ্যোতি নিক্ষেপ করে বিশেষ দৃষ্টিতে নিরক্ষণ করে নীরেনের হাতের আঙুল গুলি আর একটু বেশি করে চেপে ধরে বলল, " তুমি " বলেই চোখ বন্ধ করার মুহূর্তেই হাত আলগা হয়েগেল। নীরেন তুমির উত্তর দেওয়ার আগেই দেখল বীণার তার আর নেই কেটে গেছে।